ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং খনিজ সম্পদে স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করল কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতের বিস্তৃত এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (EEZ) ও গভীর সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে থাকা মূল্যবান খনিজ এবং হাইড্রোকার্বনের সন্ধান চালাতে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে ‘ন্যাশনাল অফশোর এক্সপ্লোরেশন স্কিম’ (National Offshore Exploration Scheme)। প্রশাসনিক ও বৈজ্ঞানিক বৃত্তে উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই উদ্যোগটি ‘সমুদ্র মন্থন স্কিম’ নামেই বেশি পরিচিত লাভ করেছে।
পৌরানিক কাহিনীতে ‘সমুদ্র মন্থন’-এর মাধ্যমে রত্ন আহরণের কথা বলা হয়েছিল; ঠিক সেইভাবেই এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের নিজস্ব সমুদ্রসীমার গভীরে থাকা দুর্লভ খনিজ ও খনিজ তেল নিষ্কাশন করে নতুন এক অর্থনৈতিক যুগের সূচনা করতে চাইছে সরকার।
কেন এই উদ্যোগ?
বর্তমানে ভারত তার চাহিদার একটি বড় অংশের অশোধিত তেল ও বিরল খনিজ উপাদান (Rare Earth Elements) আমদানির ওপর নির্ভর করে। প্রযুক্তির দ্রুত বিপ্লব, বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) শিল্প এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের যুগে লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, কপার এবং পলিমেটালিক নডিউলসের চাহিদা তুঙ্গে।
ভূবিজ্ঞানীদের মতে, বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগরের তলদেশে বিপুল পরিমাণ খনিজ ও জ্বালানি সঞ্চিত রয়েছে, যা এতদিন প্রযুক্তির অভাব ও অপর্যাপ্ত জরিপের কারণে অনাবিষ্কৃত ছিল। ‘সমুদ্র মন্থন’ প্রকল্পের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করাই প্রধান লক্ষ্য।
প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্য:
- উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার: গভীর সমুদ্রে ত্রিমাত্রিক (3D) সিজমিক সার্ভে, ড্রিলিং এবং রোবোটিক সাবমার্সিবল ব্যবহারের মাধ্যমে মানচিত্র তৈরি করা হবে।
- সরকারী ও বেসরকারী অংশীদারিত্ব: এই প্রকল্পে ইসরো (ISRO), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওশান টেকনোলজি (NIOT) এবং বেশ কয়েকটি বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
- ব্লু ইকোনমির জোর: সামুদ্রিক পরিবেশের সামঞ্জস্য বজায় রেখে পরিবেশবান্ধব উপায়ে খনিজ অনুসন্ধান চালানো হবে, যা ভারতের ‘ব্লু ইকোনমি’ (Blue Economy) নীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
- সামুদ্রিক সীমানার সার্বিক সুরক্ষা: ভারতের প্রায় ২.২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে থাকা অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমার প্রতিটি কোণ পর্যবেক্ষণ ও নথিভুক্ত করা।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি
অর্থনীতিবিদ ও ভূবিজ্ঞানীদের মতে, এই স্কিমটি ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy) অর্জনে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। কেন্দ্রীয় ভূবিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ আধিকারিক বলেন, “সমুদ্র মন্থন স্কিম কেবল জরিপ করার কাজ নয়, এটি ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। এর মাধ্যমে আমরা শুধুমাত্র আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাব না, বরঞ্চ বিশ্ব খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খলেও ভারত একটি বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।”
তবে, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী অভিযানের ক্ষেত্রে গভীর সমুদ্রের চরম চাপ, জটিল সামুদ্রিক আবহাওয়া এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের বিশ্বাস, ‘সমুদ্র মন্থন’-এর সুফল আগামী দিনে ভারতের শিল্পখাত এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এক নতুন জোয়ার আনবে, যা দেশকে একটি আত্মনির্ভর ও শক্তিশালী অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
