পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ (পূর্বতন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পরিবর্তিত রূপ) নিয়ে রাজ্যজুড়ে জোরকদমে চলছে ভেরিফিকেশন বা তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া। কার টাকা মিলবে আর কার আবেদন বাতিল হবে— তা নিয়ে যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই এই বিষয়ে এক বড়সড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের এক জনসভা থেকে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, কোনো প্রকৃত প্রাপকই অন্নপূর্ণা যোজনার মাসিক ৩,০০০ টাকা থেকে বঞ্চিত হবেন না। তবে অযোগ্যদের ক্ষেত্রে সরকার কড়া অবস্থান নিচ্ছে।
৩০ আগস্ট পর্যন্ত চলবে যাচাই প্রক্রিয়া
মুখ্যমন্ত্রী জানান, অন্নপূর্ণা যোজনার এই বিশেষ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া আগামী ৩০ আগস্ট, ২০২৬ পর্যন্ত চালানো হবে। রাজ্য সরকার অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে ডাটাবেস স্ক্রুটিনি করতে চাইছে যাতে কোনো ভুয়ো বা অযোগ্য আবেদনকারী সরকারি কোষাগারের অপব্যবহার করতে না পারে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “দলমত, বর্ণ বা ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত যোগ্য মা-বোনদের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই ১ কোটি ২০ লক্ষ নারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রথম কিস্তির টাকা পৌঁছে গিয়েছে।”
বাতিল হয়েছে ২৭.৮ লক্ষ আবেদন: কেন এই কড়াকড়ি?
রাজ্য প্রশাসনের সাম্প্রতিক বৈঠক থেকে জানা গেছে, অন্নপূর্ণা যোজনার অধীনে মোট ১.৬ কোটি আবেদনপত্র জমা পড়েছিল। এর মধ্যে গভীর যাচাইয়ের পর ১.২ কোটি আবেদন অনুমোদন করা হলেও, প্রায় ২৭.৮ লক্ষ আবেদন বাতিল করা হয়েছে।
যাচাই প্রক্রিয়ায় উঠে এসেছে একাধিক অসঙ্গতি। অনেকেই ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর সময় থেকে সুবিধা পেলেও নতুন স্ক্রুটিনিতে দেখা গেছে যে তারা সরকারি কর্মচারী, পেনশনভোগী কিংবা আয়কর দাতা, যা এই প্রকল্পের নিয়মের পরিপন্থী। তা ছাড়া অনেকের আধার কার্ড লিংক না থাকা, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্যে ভুল থাকা এবং একই মোবাইল নম্বর একাধিক সরকারি প্রকল্পে (যেমন পিএম-কিসান) ব্যবহার করার কারণেও আবেদন আটকে গেছে।
পোর্টাল নিয়ে সরকারের নয়া পদক্ষেপ: চালু হচ্ছে ‘এডিট’ অপশন
কারিগরি ত্রুটি বা তথ্যের সামান্য ভুলের কারণে যেসব যোগ্য মহিলাদের আবেদন বাতিল বা হোল্ড (Hold) হয়ে রয়েছে, তাদের জন্য রাজ্য সরকার এক বড় স্বস্তির পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অন্নপূর্ণা যোজনার অফিশিয়াল পোর্টালে একটি নতুন “Edit Option” (এডিট অপশন) চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে:
- আবেদনকারী নারীরা পোর্টালে লগ-ইন করে জানতে পারবেন ঠিক কী কারণে তাদের আবেদনটি বাতিল হয়েছে।
- ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, KYC ত্রুটি বা আধার লিংকের ভুলগুলি নিজেরা সংশোধন করে পুনরায় আবেদন জমা দিতে পারবেন।
- ভুল সংশোধনের পর যাচাই প্রক্রিয়া সফল হলে, পুনরায় সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (DBT) টাকা আসা শুরু হবে।
কারা পাবেন না এই সুবিধা?
মুখ্যমন্ত্রী আরও একবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সরকারি নিয়ম না মানলে এই প্রকল্পের সুবিধা মিলবে না। অযোগ্যদের তালিকা থেকে বাদ পড়ার মূল কারণগুলি নিচে তুলে ধরা হলো:
- সরকারি চাকরি ও আয়কর: পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি চাকরিজীবী, পেনশনভোগী বা আয়কর দাতা হলে আবেদন বাতিল হবে।
- ভ্যাকসিন ও শিক্ষা নীতি: সরকারের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নীতির সঙ্গে যারা অসহযোগিতা করবেন (যেমন— শিশুদের প্রয়োজনীয় সরকারি টিকাকরণ না করানো বা সরকারি স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো) তারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না।
- ভুল নথিপত্র: আধার ও ভোটার আইডি কার্ডের সাথে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্যের অমিল থাকলে বা ভুয়ো প্রমাণপত্র দিলে কড়া আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
নতুন সরকারের বয়স মাত্র দু-মাস পেরিয়েছে, এর মধ্যেই মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতায়নের এই প্রকল্পকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ত্রুটিমুক্ত করতে কোমর বেঁধে নেমেছে প্রশাসন। ৩০ আগস্টের মধ্যে এই স্ক্রুটিনি পর্ব মিটে গেলে আরও বহু যোগ্য মহিলা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন বলে আশা করছে নবান্ন।
