রাজ্যের স্কুল শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের জন্য অবশেষে কাটল দীর্ঘদিনের আইনি ও প্রশাসনিক জট। প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর রাজ্য স্কুল শিক্ষা দফতরের নির্দেশে ১ জুলাই, ২০২৬ (বুধবার) থেকে আবারও পুরোদমে চালু হলো অনলাইন বদলি বিষয়ক পোর্টাল ‘উৎসশ্রী’(West Bengal Utsashree scheme)। এবার থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অশিক্ষক কর্মীরা সাধারণ বদলি (General Transfer) সহ সব ধরনের বদলির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন।
স্কুল শিক্ষা দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০১৫ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন (জেনারেল ট্রান্সফার, ট্রান্সফার অন স্পেশ্যাল গ্রাউন্ড অ্যান্ড রি-অ্যালোকেশন) বিধির নিয়ম মেনেই এই পোর্টালটি পুনরায় সচল করা হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে শিক্ষামহল স্বাগত জানালেও, বিগত কয়েক বছর ধরে আটকে থাকা পুরনো আবেদনগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষকদের একাংশ।
কেন বন্ধ ছিল উৎসশ্রী পোর্টাল?
২০২১ সালের অগস্ট মাসে শিক্ষকদের ঘরের কাছে বদলির সুবিধা দিতে ‘উৎসশ্রী’ পোর্টাল চালু করেছিল তৎকালীন রাজ্য সরকার। তবে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শিক্ষক এবং গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ার আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থে এই পোর্টালে সাধারণ বদলির আবেদন সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেওয়া হয়। এরপর দফায় দফায় এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়িয়ে তা ৩০ জুন, ২০২৬ পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছিল। বর্তমানে স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল পর্যায়ে আসায় পূর্ববর্তী সমস্ত নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নিল রাজ্য সরকার।
Link: https://banglarshiksha.gov.in/utsashree/
পুরনো আবেদন নিয়ে জটিলতার আশঙ্কা
পোর্টাল খোলায় শিক্ষকমহলে খুশির হাওয়া থাকলেও তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। শিক্ষকদের একাংশের দাবি, ২০২১ ও ২০২২ সালে পোর্টাল বন্ধ হওয়ার আগে যে হাজার হাজার শিক্ষক বদলির আবেদন করেছিলেন, সেগুলির এখনও কোনও নিষ্পত্তি হয়নি।
“বহুবার দাবি জানানোর পর অবশেষে পোর্টালে আবেদন নেওয়া শুরু হলো, এটি ইতিবাচক। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে যাঁদের আবেদনের এখনও কোনো মীমাংসা হয়নি, তাঁদের বদলি আগে করা উচিত। পুরনো আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার না দিয়ে নতুন করে আবেদন নিলে আবার আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।” — স্বপন মণ্ডল, সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতি
শিক্ষকদের সংগঠনগুলির আরও অভিযোগ, বিগত দিনে শুধুমাত্র আপস-বদলির (Mutual Transfer) সুযোগ খোলা রাখা হলেও বাস্তবে বহু আবেদনপত্রের কোনো ফয়সালা করা হয়নি। ফলে নতুন করে পোর্টাল খোলার আগে সেই বকেয়া কাজ শেষ করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।
স্বচ্ছতা ও শূন্যপদ পূরণের দাবি
বদলি প্রক্রিয়া চালুর পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবি তুলেছে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন। শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিঙ্কর অধিকারী জানান:
- দুর্নীতিমুক্ত প্রক্রিয়া: বদলির এই অনলাইন প্রক্রিয়ায় যাতে কোনো ধরনের স্বজনপোষণ বা দুর্নীতি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।
- নিজের জেলায় সুযোগ: দূরবর্তী জেলায় কর্মরত শিক্ষকেরা যাতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিজের জেলা বা বাড়ির কাছাকাছি বদলি পেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
- নতুন নিয়োগ: শুধু বদলি নয়, গ্রামীণ ও দূরবর্তী স্কুলগুলিতে শিক্ষকের অভাব মেটাতে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবিলম্বে সমস্ত শূন্যপদ পূরণ করা দরকার।
চার বছরের অপেক্ষা শেষে উৎসশ্রী পোর্টাল খোলায় দূর-দূরান্তে কর্মরত অসুস্থ বা প্রবীণ শিক্ষকেরা দ্রুত বাড়ির কাছাকাছি আসার সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে শিক্ষা দফতর পুরনো আবেদন ও নতুন আবেদনের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় বজায় রেখে এই প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।
