পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ক্যাবিনেট সম্প্রতি সপ্তম রাজ্য বেতন কমিশন (7th State Pay Commission) গঠনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই রাজ্য সরকারি কর্মীদের মনে বেতন বৃদ্ধি নিয়ে বিপুল উৎসাহ তৈরি হয়েছে। এই আবহে সামাজিক মাধ্যমে বা বিভিন্ন খবরের শিরোনামে “বেসিক বেতন ২ লাখ টাকা ছাড়াবে” সংক্রান্ত যে আলোচনা চলছে, তার আসল গাণিতিক হিসেব এবং বাস্তব ভিত্তিটি একটু বিশদে বুঝে নেওয়া যাক।
কোনো পে কমিশনেই ঢালাওভাবে বা রাতারাতি সমস্ত স্তরের কর্মীর মূল বেতন (Basic Pay) ২ লাখ টাকা হয়ে যায় না। তবে সপ্তম বেতন কমিশনের পে-ম্যাট্রিক্সের কাঠামো এবং ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর (Fitment Factor) বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, শীর্ষস্তরের বা অভিজ্ঞ পদস্থ আধিকারিকদের ক্ষেত্রে এই ২ লাখের অঙ্কটি স্পর্শ করা বা তা ছাড়িয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
১. কীভাবে নির্ধারিত হয় নতুন বেসিক? (ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের হিসেব)
নতুন বেতন কমিশন চালুর মূল চাবিকাঠি হলো ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর। সপ্তম পে কমিশনের ক্ষেত্রে দেশজুড়ে সাধারণত ২.৫৭ থেকে ২.৮১ গুণের একটি ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর মডেল ব্যবহার করা হয়।
যখন একটি নতুন পে কমিশন কার্যকর হয়, তখন কর্মীদের তৎকালীন বেসিক বেতনের সঙ্গে এই নির্দিষ্ট ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর গুণ করে নতুন বেসিক পে বা মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়।
একটি সাধারণ উদাহরণ:
কোনো অভিজ্ঞ সরকারি কর্মীর বর্তমান ষষ্ঠ পে কমিশনের (ROPA 2019) নিয়ম অনুযায়ী বেসিক বেতন যদি ₹৮০,০০০ বা তার বেশি হয়, তবে ২.৫৭ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর গুণ করার সাথে সাথেই তাঁর নতুন সংশোধিত বেসিক পে দাঁত কাটার মতো বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে:
$$\text{₹৮০,০০০} \times 2.57 = \text{₹২,০৫,৬০০}$$
২. কার বা কোন পদের বেসিক ২ লাখ ছাড়াবে?
পে-ম্যাট্রিক্সের একদম নিচের স্তরে (যেমন গ্রুপ-ডি বা এন্ট্রি লেভেল) বেসিক ২ লাখ হওয়া সম্ভব নয়। সেখানে ন্যূনতম বেসিকের একটি নির্দিষ্ট সীমা (যেমন ১৮,০০০ বা তার বেশি) ঠিক করা হয়। তবে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলিতে মূল বেতন ২ লাখের ঘর অনায়াসেই অতিক্রম করবে:
- শীর্ষস্তরের আমলা ও আধিকারিক: রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থ সচিব (যেমন আইএএস বা সমতুল্য রাজ্য ক্যাডারের শীর্ষ আধিকারিক), বিভাগীয় প্রধান এবং সিনিয়র ডিরেক্টরদের বর্তমান মূল বেতন এমনিতেই বেশ উচ্চ স্তরে থাকে। পে-ম্যাট্রিক্সের উচ্চতর লেভেলগুলিতে (যেমন লেভেল ১৪, ১৫ বা তার উপরে) সর্বোচ্চ বেসিক পে ₹২,২৫,০০০ থেকে ₹২,৫০,০০০ পর্যন্ত নির্ধারিত হয়ে থাকে।
- দীর্ঘকালীন চাকুরিজীবী: যাঁরা প্রায় ২৫-৩০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে রাজ্য সরকারি চাকরিতে আছেন এবং ধারাবাহিক পদোন্নতি (Promotion) ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে পে-ম্যাট্রিক্সের ওপরের দিকে পৌঁছেছেন, রিভিশনের পর তাঁদের বেসিকও ২ লাখের ঘর স্পর্শ করবে।
৩. বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য চিত্র
সপ্তম পে কমিশনের ম্যাট্রিক্স অনুযায়ী বেতনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন স্তরটি সাধারণত নিচের কাঠামোর মতো দেখায়:
| কর্মীর স্তর / পদমর্যাদা | প্রারম্ভিক বেসিক (এন্ট্রি লেভেল) | সর্বোচ্চ বেসিক (শীর্ষ ধাপ) |
| সর্বনিম্ন স্তর (গ্রুপ-ডি / লেভেল ১) | ₹১৮,০০০ থেকে শুরু | ₹৫৬,৯০০ পর্যন্ত |
| মধ্যম স্তর (গ্রুপ-সি ও বি) | ₹৩৫,৪০০ – ₹৫৬,১০০ থেকে শুরু | ₹১,১২,৪০০ – ₹১,৭৭,৫০০ পর্যন্ত |
| উচ্চপদস্থ / শীর্ষ স্তর (গ্রুপ-এ / ক্যাবিনেট বা সচিব স্তর) | ₹১,৪৪,২০০ থেকে শুরু | ₹২,২৫,০০০ – ₹২,৫০,০০০ (এখানেই ২ লাখ ছাড়ানোর হিসেবটি মেলে) |
টেক-অ্যাওয়ে বা আসল সারকথা
খবরের শিরোনামে যখন বলা হয় “বেতন ২ লাখ ছাড়াবে”, তখন বুঝতে হবে এটি মূলত সর্বোচ্চ বেতন কাঠামো বা উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের বেসিক পে-স্কেলের কথা নির্দেশ করছে। নতুন পে কমিশন গঠিত হওয়ার পর চূড়ান্ত পে-ম্যাট্রিক্স ও ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের হার রাজ্য সরকার কীভাবে অনুমোদন করে, তার ওপরই নির্ভর করছে কোন স্তরের কর্মীর হাতে ঠিক কত টাকা বেতন আসবে। তবে সামগ্রিকভাবে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বেতন যে একধাক্কায় অনেকটাই বাড়তে চলেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
